বুধবার   ১৬ অক্টোবর ২০১৯   আশ্বিন ৩০ ১৪২৬   ১৬ সফর ১৪৪১

তিন কন্যার গল্প

বিনোদন ডেস্ক

মেহেরপুর বার্তা

প্রকাশিত : ০৩:১৭ এএম, ১৭ নভেম্বর ২০১৮ শনিবার

তারা তিন বোন। তিন কন্যা নামেই ঢাকাই ছবির দর্শকদের কাছে পরিচিতি তাদের। তাই তিন কন্যা নাম নিলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে তিন বোন- সুচন্দা, ববিতা ও চম্পার মুখ। সেই সত্তর আশি দশকের রুপালি জগৎ তাদের আলোয় ছিল আলোকিত। তার আগে সুচন্দার যাত্রা। ঐ সময়টা কেবল সুচন্দা আর ববিতা রাজত্ব করে গেছেন নায়িকা হিসেবে।

শোবিজে সুচন্দা'র (পারিবারিক নাম কোহিনুর আক্তার চাটনী) আগমন ঘটে ১৯৬৫ সালে। অভিনয় শুরু করেন প্রখ্যাত অভিনেতা কাজী খালেকের একটি প্রামাণ্যচিত্রে। সুভাষ দত্ত পরিচালিত 'কাগজের নৌকা' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ১৯৬৬ সালে তার চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সালে হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিু নিয়ে চলচ্চিত্র 'বেহুলা'য় রাজ্জাকের বিপরীতে অভিনয় করেন। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছবি 'জীবন থেকে নেয়া'। এছাড়াও ষাটের দশকের শেষের দিকে গোলাম মুস্তফার বিপরীতে 'চাওয়া পাওয়া' আজিমের বিপরীতে 'নয়নতারা', রাজ্জাকের বিপরীতে 'সুয়োরানী দুয়োরানী' এবং সত্তরের দশকে 'যে আগুনে পুড়ি', 'কাচের স্বর্গ', 'অশ্রু দিয়ে লেখা' তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র।

অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেছেন। জহির রায়হানের জীবদ্দশায় 'টাকা আনা পাই' ও 'প্রতিশোধ' চলচ্চিত্র দুটি প্রযোজনা করেন। সুচন্দা প্রযোজিত 'তিন কন্যা' ছবিটি জাতীয় পুরষ্কার অর্জন করে। 'তিন কন্যা' মুক্তি পায় ১৯৮৬ সালে। এছাড়াও বেহুলা লখিন্দর, বাসনা ও প্রেম-প্রীতি চলচ্চিত্রগুলো প্রযোজনা করেন। তার পরিচালিত প্রথম সিনেমা 'সবুজ কোট, কালো চশমা'। ২০০৫ সালে স্বামী জহির রায়হানের 'হাজার বছর ধরে' উপন্যাসের আলোকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন এবং সেরা প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।

বড় বোন সুচন্দা'র হাত ধরে চলচ্চিত্রে আসেন ববিতা। এখন পর্যন্ত চলচ্চিত্রে না পাওয়া বলতে কিছু নেই ববিতার অভিধানে। সেইসঙ্গে জীবন তাকে অফুরন্ত উপহার দিয়েছে বলেও বিশ্বাস করেন তিনি। ঢাকাই ছবির দর্শকদের কাছে 'অনঙ্গ বউ' নামেই ববিতা পরিচিত। তার পারিবারিক নাম ফরিদা আক্তার পপি। ডাগর ডাগর চোখ আর সেই চোখের মায়াবী চাহনির সঙ্গে অভিনয়ের জাদু দিয়ে দর্শকদের হৃদয়ে এখনো স্বপ্নের রানী হয়েই আছেন ববিতা। ববিতার চলচ্চিত্রে কাজের শুরুটা একটু অন্যরকম। কিছুটা হাস্যকরও বটে!ববিতার নায়িকা হওয়ার জন্য সাজগোজ করে সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন। পরিচালক তো ববিতাকে দেখে অবাক!ববিতার সামনে চুপ করে বসে পড়লেন। এত সাজগোজ করে এলে ববিতাকে দেখবেন কী করে!ববিতাও মাথাটা বুকের কাছে সেই যে নামিয়ে রাখলেন, আর ওঠালেন না। সে এক বিব্রতকর পরিস্থিতি! অবশেষে সত্যজিৎ রায় তিন ধরণের তিনটা সংলাপ হাতে ধরিয়ে বলেছিলেন, 'কাল সকালে ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে দেখা করো। এ সংলাপগুলো মুখস্ত করে আমার সামনে আসবে।'

ভয়ে ভয়ে তিনটি সংলাপ তুলে নিলেন ববিতা। পরদিন স্টুডিওতে গিয়ে পরিচালকের সামনে গিয়ে তখনো সংলাপগুলো বিড়বিড় করে মুখস্ত করছেন!পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের মনে ধরলো। ব্যস্ পরীক্ষায় পাস!এরপর স্ক্রিন টেস্ট!পরের ইতিহাস তো সবার জানা। ববিতা-ই হলেন সত্যজিৎ রায়ের অনঙ্গ বউ! অশনিসংকেত ছবিতে সৌমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপরীতে অনঙ্গ বউ চরিত্রে ববিতা অভিনয় করেন এবং এই ছবির মাধ্যমেই ববিতা চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৭৩ সালের ঘটনা এটি! ববিতার মতে, 'চলচ্চিত্রে অভিনয় করবেন এমন ভাবনা তার মনেই ছিল না। বাড়িতে পড়াশোনার পাশাপাশি নাচ, গান, আবৃত্তি শিখতে হতো ঠিকই; কিন্তু সেগুলো তাকে চলচ্চিত্রের দিকে তাকে নিয়ে যাবে, এ কথা ববিতা ভাবেননি কখনো! বড়বোন সুচন্দা অভিনীত জহির রায়হানের সংসার চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে ববিতার আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৮ সালে।

মাত্র পনের বছর বয়েসে!ছবিটিতে রাজ্জাক আর সুচন্দার মেয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তার ইচ্ছার বিরুদ্ধ। এরপর জহির রায়হান জ্বলতে সুরুজ কা নিচে নামে একটি উর্দু ছবি শুরু করেন; কিন্তু সে ছবিটি শেষ করতে পারেননি। ১৯৬৯ সালে জহির রায়হানের ‘শেষ পর্যন্ত’ ছবিতে নায়িকা হিসেবে প্রথম অভিনয় করেন ববিতা। পথচলা হিসেবে এভাবেই শুরু। বড় বোন সুচন্দার স্বামী ছিলেন জহির রায়হান। চলচ্চিত্র বিষয়ক খুঁটিনাটি অনেক কিছু তার কাছ থেকেই শিখেছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পরপরই ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে বড়ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে মিরপুরে শহীদ হন জহির রায়হান। ববিতা এ নিয়ে আফসোস করে বলেন, জহির ভাই ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ ছবিটা বানাতে চেয়েছিলেন।

খুব মিষ্টি সংলাপ লিখতেন তিনি। কিছু একটা মনে হলেই কম্বল মাথার ওপর টেনে লিখে ফেলতেন। তারপর কম্বল থেকে বের হয়ে এসে সেগুলো পড়ে শোনাতেন। জহির ভাই বলতেন, 'লেট দেয়ার বি লাইট'ই হবে আমার শেষ ছবি। ঐ ছবিতে ইভা নামের অদ্ভুত চরিত্রটি ছিল আমার। কি সুন্দর সংলাপ ছিল সেই ছবিতে, 'তপু, আই ওয়ান্ট টু বি দ্য মাদার অব ইয়োর সান।' কিন্তু দুঃখের বিষয় জহির ভাই ছবিটা শেষ করে যেতে পারলেন না। ১৯৭৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রবর্তনের পর টানা তিনবার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার জেতেন ববিতা। তাছাড়া একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান 'শ্রেষ্ঠ প্রযোজক' এবং 'শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী' ক্যাটাগরিতে। তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে সবচেয়ে বেশিবার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করেছেন। ২০১৮ সালে চলচ্চিত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মাধ্যমে 'আজীবন সম্মাননা'য় ভূষিত হন দর্শকপ্রিয় এই অভিনেত্রী।

এবার তিন বোনের ছোট বোন চম্পা'র (পারিবারিক নাম গুলশান আরা আক্তার) কথায় আসি। শিবলী সাদিক পরিচালিত 'তিনকন্যা' ছবির মাধ্যমে চম্পার চলচ্চিত্র জগতে আগমন। সে ছবিতে বাকি দুই কন্যা হিসেবে চম্পার দুই বোন সুচন্দা আর ববিতা অভিনয় করেন। চম্পার অভিনয় দক্ষতা ও ছবির ব্যবসায়িক সাফল্য তাকেও চলচ্চিত্রে সাফল্য এনে দেয়। সামাজিক ও অ্যাকশন-উভয়ধর্মী চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখেননি। তিনি সত্যজিৎ রায়ের ছেলে সন্দ্বীপ রায়ের 'টার্গেট' ছবিতে এবং বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের 'লাল দরজা' ছবিতে অভিনয় করার সুযোগ পান।

এভাবে চম্পা চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে মেলে ধরেন। চম্পার মূল বৈশিষ্ট্য গ্ল্যামার, ফ্যাশন সচেতনতা এবং পোশাকে বৈচিত্র্যময়তা। গৌতম ঘোষ পরিচালিত 'পদ্মা নদীর মাঝি' ছিল তার সবচেয়ে বড় মাপের কাজ। বারো বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে শতাধিক সিনেমাতে অভিনয় করেছেন তিনি। সুচন্দা-ববিতা কাজে অনুপস্থিত থাকলেও চম্পা এখনো অভিনয় করে চলেছেন। গত পহেলা বৈশাখে শক্তিমান অভিনেতা আলমগীর পরিচালিত 'একটি সিনেমার গল্প' ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। তাছাড়া চম্পার একমাত্র সন্তান এশা দেশের বাইরে থাকায় প্রায়ই তিনি মেয়েকে সময় দিতে দেশের বাইরে থাকেন, যে কারণে তার কাজ করা হয়ে ওঠে না।