মঙ্গলবার   ১৯ মার্চ ২০১৯   চৈত্র ৫ ১৪২৫   ১২ রজব ১৪৪০

১৯

লোভাছড়ার নিসর্গে নৌবিহার

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ জানুয়ারি ২০১৯  

সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তের বড় বড় সবুজ পাহাড় ছুঁয়ে নেমেছে ঝর্ণা। আর ঝাঁপিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তে। চারদিকে সবুজ বেষ্টিত চা-বাগান, সারি সারি গাছ, পাহাড় আর বালুসমৃদ্ধ স্বচ্ছ পানির বহমান নদী। অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অনন্য রূপ হচ্ছে লোভাছড়া।

পাহাড়, মেঘ আর স্বচ্ছ নদীর পানির সঙ্গে নীল আকাশের মিতালি। স্রোতের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। স্বচ্ছ নীলাকাশে সাদা বক আর বিভিন্ন পাখির ওড়াউড়ি। আর মাঝে-মধ্যে মাঝির কণ্ঠে মুর্শিদী বা সিলেটের আঞ্চলিক গান। দারুণ পরিবেশ সৃষ্টি হয় শীতের লোভাছড়ায়। সিলেটের কানাইঘাট থেকে সুরমার বুক চিরে লোভারমুখ বা ভারত সীমান্তের জিরোপয়েন্টে যেতে নৌকায় ঢেউয়ের নাচুনীর তালে তালে দু’ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন লোভাছড়া চা-বাগানের কাছের জিরোপয়েন্টের পাথর কোয়ারির কাছে। কানাইঘাট লঞ্চঘাট থেকে লোভারমুখ বা পাথর কোয়ারি পর্যন্ত নৌকা চলাচল করে নিয়মিত। কেউ ইচ্ছা করলে নৌকা রিজার্ভ করতে পারেন নৈসর্গিক লোভাছড়া যাওয়ার জন্য।

লোভাছড়া মূলত একটি নদী। সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার উত্তর-পূর্ব সীমান্ত ঘেঁষা খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে বয়ে চলছে অপূর্ব স্বচ্ছধারার এ লোভাছড়া। সবুজ পাহাড়, নীলাকাশ ও স্বচ্ছ পানি নিয়ে ভিন্নমাত্রার এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে লোভাছড়ায় ও নদীর চারদিকে। নীলাকাশে বক আর বিভিন্ন পাখির ওড়াউড়ি, জেলেদের মাছধরা ও দু’কূলজুড়ে কৃষকের কর্মব্যস্ততা, কিশোর-কিশোরী আর খাসিয়া রমণীদের জলক্রীড়ায় মাতিয়ে তোলা অপূর্ব পরিবেশের মায়াজালে বারবার কাছে টানবে লোভাছড়া ভ্রমণ। শীতের নীলাকাশের ক্ষণে ক্ষণে রূপ পাল্টিয়ে চোখ ঝলসিয়ে দেবে। চা-বাগানের কাছে পোষা হরিণ ও হাতির চলাচল আর সকালের বনমোরগের ডাক ও একটু দূরের সবুজ খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় ও পাথর উত্তোলনের কার্যক্রমে মোহনীয় পরিবেশ মাতাল করছে লোভাছড়া চা-বাগান সংলগ্ন অনুপম দৃশ্য।

যেতে পড়বে মুলাগুল বাজার। উত্তরে বড়গ্রামের সামনে মাইঞ্জিরি নামক ভারতের এক স্থান। এখানে রয়েছে ভারতের একটি ঝুলন্ত ব্রিজ। সেটির পূর্বে ভারতের আপা ও পশ্চিমে ভারতের বড়ছড়া খাসিয়া পুঞ্জি ও দক্ষিণে বাংলাদেশের বড়গ্রাম আর উত্তরে রয়েছে ভারতের মেঘালয় থেকে চলে আসা লোভাছড়া খাল। সেটির উজান থেকে নেমে আসছে ঝরনার মতো পরিষ্কার পানি যা বাংলাদেশের লোভানদী হয়ে চরিপাড়া লোভারমুখ নামক স্থানে এসে মিলিত হয়েছে সুরমা নদীতে। উজানের মেঘালয় থেকে ছুটে আসা পানি ঝরনার মতো চকচকে আর সুরমা নদীর পানি ভারতের বরাক নদী থেকে ছুটে আসা ঘোলা পানি বা লোনা পানি। পাশাপাশি দু’নদীর দু’রকম স্রোত দারুণ সৌন্দর্য বিলিয়ে দিচ্ছে।

এ স্থানে এলে মনে হয় দিগন্তজোড়া বিস্তীর্ণ জলরাশি। নীল চকচকে আকাশ হঠাৎ মেঘে ঢেকে গেলেই মনে হয় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। পথে যেতে যেতে চোখে পড়বে ছোট-বড় পাহাড় টিলার সারি আর আরও দূরে তাকালে দেখতে পাবে ভারতের মেঘালয়ের মায়াবী পাহাড় হাতছানি দিয়ে ডাকছে। পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে থাকে সাদা মেঘ, সে এক অভাবনীয় দৃশ্য।

চা-বাগান আর দু’কূলজুড়ে আবাদের সবুজ পরিবেশ আর নিরিবিলির মধ্যে স্নিগ্ধ বাতাস ছাড়াও লোভাছড়ার ব্রিটিশ আমলের (১৯২৫ খ্রিঃ) ঝুলন্ত ব্রিজ ও প্রাকৃতিক ঝরনা, খাল-লেক পরিবেশকে নান্দনিকতা দিয়েছে। ঝুলন্ত ব্রিজকে স্থানীয়রা ‘লটকনির পুল’ বলে অভিহিত করে থাকেন। বলে রাখি লোভাছড়া চা-বাগান হচ্ছে বন্যপ্রাণীর অভয়াশ্রম। বর্ষাকালের সবুজ চা-বাগান আর পাহাড় সবুজের সমারোহ হয়। আর শীতকালে পাহাড় ও কুয়াশায় ফেনিল দৃশ্য অপূর্ব করে তোলে সিলেটের লক্ষ্মীপ্রসাদ ইউনিয়নের লোভাছড়া। নদীর নামেই লোভাছড়া। এখানকার খাসিয়াপুঞ্জি বাড়তি খোরাক দেবেই। আর রাজা-রানীর পুরাকীর্তি, আউলিয়া মীরাপিং শাহর মাজার আর পাথর কোয়ারি দেখতে লোভাছড়া ডাকছে আমার।

নান্দনিক দৃশ্য দেখতে দেখতে, নৌকার ঢেউয়ের তালে তালে রোদের কষ্ট ভুলে যাবে যে কেউ। নৌকায় যেতে যেতে যে দৃশ্য চোখে পড়ে তা দেখে চোখ ফেরানো প্রায় অসম্ভব। পাহাড়ের সবুজ আর স্বচ্ছ পানি যে কাউকেই মুহূর্তেই বানিয়ে দেবে প্রকৃতিপ্রেমী। আর হাতের ক্যামেরা স্মৃতিকে ধরে রাখবে আর পরবর্তী সময়ে নস্টালজিয়ায় ভুগাবে নিশ্চয়ই।

কীভাবে যেতে হবে

প্রথমে সিলেটে আসতে হবে। বাস-ট্রেন বা বিমানপথে সিলেটে যাওয়া যায়। সড়ক, রেল ও আকাশ পথে ঢাকা থেকে সরাসরি সিলেট যেতে পারেন। চট্টগ্রাম থেকেও সিলেটে যাওয়া যায়। ঢাকার ফকিরাপুল, সায়দাবাদ ও মহাখালী বাস স্টেশন থেকে সিলেটের বাসগুলো ছাড়ে। ভাড়া ৮০০ থেকে ১১০০ টাকা। এছাড়া ননএসি বাস সিলেটে যায়। ভাড়া ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা। ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস। সপ্তাহের প্রতিদিন দুপুর ২টায় ছাড়ে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস এবং বুধবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন রাত ০৯টা ৫০ মিনিটে ছাড়ে উপবন এক্সপ্রেস। শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন বিকাল ৪টায় ছাড়ে কালনী এক্সপ্রেস। ভাড়া শ্রেণীভেদে দেড়শ’ থেকে ১ হাজার ১৮ টাকা।

এরপর জাফলং রোডে যাত্রা শুরু করে মাইক্রো বা বাস যাবে কানাইঘাট বাজার পর্যন্ত। সিলেট শহর থেকে কানাইঘাট সদরে বাসভাড়া সর্বোচ্চ ৬০ টাকা এবং সিএনজি-অটোরিকশা ভাড়া সর্বোচ্চ ১০০ টাকা। রিজার্ভ সিএনজি ৫০০-৭০০ টাকা হবে। তিন পথেই সিএনজিযোগে যাওয়া যাবে কানাইঘাটে। লঞ্চঘাট থেকে যেতে হবে নৌকায় করে। জনপ্রতি ৪০ থেকে ৬০ টাকা নৌকা ভাড়া লাগবে।

থাকা ও খাওয়া

থাকা ও খাওয়ার জন্য কানাইঘাটে ব্যবস্থা আছে। আয়েশি ও ইচ্ছামতো থাকা ও খাওয়ার জন্য সিলেটে অনেক ব্যবস্থা আছে। এখানকার পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্ট বা পাশের কয়েকটি রেস্টুরেন্টে ভর্তা বা ঘরোয়া পরিবেশের আয়োজন পর্যটকদের সন্তুষ্টি দিতে সক্ষম। সিলেটের বিভিন্ন মান-দামের হোটেল বেছে নিতে পারে যে কেউ।

লোভাছড়া

মেঘালয় পর্বতমালা

লোভার মুখের দৃশ্য-দু’রঙের দু’ধারা বহে নিরবধি

লোভাছড়ার পাশ দিয়ে ভারত সীমান্তে হারিয়ে গেছে ‘নুনগাঙ’। ‘নুনগাঙ’ প্রায় নদীর মতো হলেও এটি আসলে ঘোলা পানির একটি খাল যা লোভাছড়া নদী থেকে উৎপন্ন হয়েছে।

মেহেরপুর বার্তা
মেহেরপুর বার্তা